পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের প্রায় ২০ দিন পর অবশেষে সরাসরি মুখ খুললেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে এবার প্রচলিত রাজনৈতিক মঞ্চ বা সংবাদ সম্মেলনে নয়, নিজের রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রধান মাধ্যম হিসেবে তিনি বেছে নিলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুককে।
দীর্ঘ ফেসবুক লাইভে কেন্দ্রীয় সরকার, বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ তোলেন তিনি। একই সঙ্গে জানান, আগামীতেও রাজনৈতিক লড়াইয়ে তার অন্যতম ভরসা হবে ফেসবুক লাইভ।
গত ৪ মে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশ হয়। ফলে বিজেপি আবারও সরকার গঠন করে। এরপর থেকে জনসমক্ষে খুব একটা দেখা যায়নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। কেবল একটি সাংবাদিক বৈঠক করেছিলেন তিনি। এরপর শনিবার বিকালে আচমকাই ফেসবুক লাইভে এসে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন তৃণমূল নেত্রী।
প্রায় পুরো বক্তব্যজুড়ে ছিল ক্ষোভ, হতাশা এবং রাজনৈতিক প্রতিরোধের বার্তা। মমতা দাবি করেন, নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ২২০ থেকে ২৩০টি আসন পাওয়ার কথা ছিল; কিন্তু শেষ মুহূর্তে পুরো পরিস্থিতি বদলে দেওয়া হয়েছে। তার অভিযোগ, জাতীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো প্রমাণ তিনি প্রকাশ করেননি, তবুও তার এ বক্তব্য ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ফেসবুক লাইভে মমতা বলেন, এটি প্রকৃত নির্বাচন ছিল কিনা, সেই প্রশ্ন আজ মানুষের মনে উঠছে। তার দাবি, সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন ভয় ও অনিশ্চয়তা কাজ করছে। কেউ চাকরি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন, কেউ ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি অস্বাভাবিক বলেও মন্তব্য করেন।
নির্বাচনের পর বিজেপির বিরুদ্ধে তৃণমূল কর্মীদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগও তোলেন তিনি। তার কথায়, দলের দুই হাজারের বেশি কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বহু হকার ও ছোট ব্যবসায়ীর জীবিকা নষ্ট হয়ে গেছে। বিভিন্ন এলাকায় দলীয় কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি।
ইভিএম নিয়েও সরব হন তৃণমূল নেত্রী। তিনি বলেন, ভোটযন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তাদের প্রয়োজন। তার অভিযোগ, ভোটের ফল স্বাভাবিক ছিল না। যদিও নির্বাচন কমিশন এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
ফেসবুক লাইভে ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়ও তুলে ধরেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আজান নিয়ে বিতর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, কিন্তু কারও ধর্মীয় অধিকার কেড়ে নেওয়া উচিত নয়। সবার জন্য একই নিয়ম হওয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের একটি ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার অভিযোগ তুলে রাজ্য সরকারের সমালোচনাও করেন মমতা। তার বক্তব্য, ছোট ছোট শিশুরা সেখানে ছবি তুলত এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থাও সেটির প্রশংসা করেছিল। সেই স্মৃতিচিহ্ন নষ্ট করা হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
সংবাদমাধ্যমের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, এখন থেকে তিনি আর প্রচলিত সংবাদমাধ্যমে কথা বলবেন না। ভবিষ্যতে কোনো বক্তব্য থাকলে তা ফেসবুক লাইভের মাধ্যমেই জানাবেন।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ক্ষমতা হারানোর পর তৃণমূল কংগ্রেস এখন নতুন ধরনের রাজনৈতিক লড়াইয়ের পথে হাঁটছে। মাঠের আন্দোলনের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে রাজনৈতিক প্রতিরোধের অন্যতম বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছেন মমতা বন্দোপাধ্যায়। বিশেষ করে তরুণ ভোটার ও শহুরে মধ্যবিত্তের কাছে পৌঁছতে এই কৌশল ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
