
শরীফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার দাবিতে শুক্রবার সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দিয়েছে ইনকিলাব মঞ্চ।
এদিন জুমার নামাজের পর এ কর্মসূচি শুরু হবে বলে বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন সংগঠনটির সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের।
সরকার এ হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে সংসদ ভবন ঘেরাও করার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
জাবের বলেন, “সাগর-রুনির মতো যেন শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার তারিখের পর তারিখ না যায়। যদি এমনটাই হয়, তাহলে আপনাদেরকেও জানিয়ে রাখি, আপাতত বিক্ষোভ মিছিল; এর পরের দিন হয়তো অবরোধ, এর পরের দিন যমুনা ঘেরাও, এর পরের দিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাও, এর পরের দিন হয়তো আমরা সংসদ ভবন ঘেরাও করব।
“আমাদেরকে অসহায় মনে কইরেন না; জনগণ আমাদের সঙ্গে আছে। আমাদেরকে অশান্ত কইরেন না। বর্তমান সরকার ও যারা যারা ইন্ধন দিচ্ছেন, কারোরই সেই সক্ষমতা নাই আমাদের সঙ্গে লড়ার।”
বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এ সংবাদ সম্মেলন করে ইনকিলাব মঞ্চ। এতে ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমাও উপস্থিত ছিলেন।
জাবের বলেন, “বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা এবং বিভাগীয় শহর, ইউনিয়ন, গ্রামে শহীদ ওসমান হাদির হত্যার ব্যাপারে আপনারা আগামীকাল বিক্ষোভ মিছিল এবং সংক্ষিপ্ত সমাবেশ কর্মসূচি পালন করুন।
“পুরো বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণকে আহ্বান করছি, আপনারা এই কর্মসূচি সফল করুন এবং শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার এবং গ্রেপ্তার নিশ্চিত করুন।”
তিনি বলেন, “শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যদি স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসেরও সম্পৃক্ততা থাকে, এর সুষ্ঠ বিচার হতে হবে। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যদি সেনাবাহিনী প্রধান ওয়াকারের সংশ্লিষ্টতা থাকে, তার বিচার হতে হবে।
“এর সঙ্গে যদি আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা থাকে, তার বিচার হতে হবে। এর সঙ্গে যদি হাসিনার সংশ্লিষ্টতা থাকে, তার বিচার হতে হবে। মানে বাংলাদেশের শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডকে কোনোভাবে ‘নাই করে’ দেওয়া যাবে না।”
ইনকিলাব মঞ্চের এ নেতা বলেন, “হাদী হত্যাকাণ্ডের যে চার্জশিট, সেটার একটা পর্যালোচনা শুনানি ছিল। এর আগে গত ১২ তারিখে তার প্রথম শুনানি ছিল এবং এজাহারকারীর পক্ষে রাষ্ট্রকে সহায়তা করার জন্য আইনজীবীরা রাষ্ট্রের কাছে দুই দিন সময় চেয়েছিল। যার পরিপ্রেক্ষিতে আজকে এই চার্জশিটটির পর্যালোচনা শুনানি হয়েছে এবং সেখানে আইনজীবীদের পক্ষ থেকে নারাজি দেওয়া হয়েছে।
“রাষ্ট্রের কোনো ধরনের আন্তরিকতা, কোনো ধরনের সদিচ্ছার প্রতিফলন আমরা শহীদ ওসমান হাদির হত্যার ব্যাপারে দেখছি না। এখন রাষ্ট্র কর্তৃক তদন্তের মাধ্যমে যেই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে, সেটা সম্পর্কে আপনাদেরকে একটু জানাতে চাই।”
জাবের বলেন, “এই যে মামলাটা, সেখানে যে তদন্ত করা হয়েছে, একদম পুরোটাই অস্পষ্টতায় ভরপুর এবং যাদেরকে আসামি করা হয়েছে, মূল কোনো আসামি ধরাছোঁয়ার বাইরে। তদন্ত প্রতিবেদনে যারা এই হত্যার পরিকল্পনা করেছে, তাদের সম্পর্কে কোনো ধরনের তথ্য উল্লেখ করা হয় নাই। তারা এখানে উল্লেখ করেছে যে, শহীদ ওসমান হাদি মাঝেমধ্যে আওয়ামী লীগের বিপক্ষে বক্তব্য দিতেন, তারা ক্ষিপ্ত হয়ে শহীদ উসমান হাদিকে গুলি করেছে।
“আমরা তাদের কাছে জানতে চাই, শহীদ ওসমান হাদিকে যদি ক্ষিপ্ত হয়েই গুলি করা যায় বা গুলি করতে হয়, তাহলে এতদিন সময় নেওয়ার তো দরকার নাই, শত কোটি টাকারও তো দরকার নাই। দুই মাস বিভিন্ন জায়গায় তাকে পর্যবেক্ষণে রাখারও দরকার নাই। এই পুরোটা একটা খুনি চক্র করেছে, যেটা এই চার্জশিটে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।”
তিনি বলেন, “ডিবির পক্ষ থেকেই জানানো হয়েছে যে, হাদিকে হত্যার জন্য ১২ তারিখেই ওইখানে পাঁচটা টিম ছিল, একজন মিস করলে আরেকজন গুলি চালাত। তাহলে এই চার্জশিটে বাকি চারটা গ্রুপের কথা কোথায়?”
প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে উদ্দেশ করে জাবের বলেন, “যে ইসি শহীদ ওসমান হাদির মৃত্যুকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে, সেই ইসির অধীনে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে যেতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে এই ইসিকে অপসারণ যদি না করা হয়, একজন নাগরিকের জায়গা থেকে ইসির বিরুদ্ধে আমরা দাঁড়াব। ইলেকশনের বিরুদ্ধে না, এই ইসির বিরুদ্ধে আমরা রাজপথে আমাদের অবস্থান গ্রহণ করব।”
জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া হাদি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর গণসংযোগের জন্য বিজয়নগর এলাকায় গিয়ে তিনি আক্রান্ত হন। চলন্ত রিকশায় থাকা হাদিকে গুলি করেন চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা আততায়ী।
গুরুতর আহত হাদিকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচার করার পর রাতেই তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর দুদিন পর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে হাদিকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ১৮ ডিসেম্বর হাদির মৃত্যুর খবর আসে।
হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। পরে মামলাটিতে হত্যার ৩০২ ধারা যুক্ত হয়। এরপর থানা পুলিশের হাত ঘুরে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ডিবি পুলিশকে।