নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার প্রায় ৩ মাস পর আগামীকাল সোমবার শপথ গ্রহণের মাধ্যমে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব নিচ্ছেন আওয়ামী লীগ নেতা সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। একই সঙ্গে তার ঘাড়ে চাপছে নগরভবনের প্রায় সাড়ে ৩শ’ কোটি টাকার দেনা।
আগেকার মেয়রদের ধারাবাহিকতায় সদ্য সাবেক মেয়র বিএনপি নেতা আহসান হাবিব কামাল যা রেখে গেছেন নগরভবনে। অবশ্য এবারের এ দেনা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। এর আগে এত দেনা রেখে যাননি অন্য কোনো মেয়র। দায়িত্ব গ্রহণের পর এই দেনা মেটানোই নতুন মেয়র সাদিকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে মনে করছেন অনেকে।
৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত নির্বাচনে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে বিএনপির মেয়র প্রার্থী দলের যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ারকে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন সাদিক আবদুল্লাহ। যদিও এ নির্বাচনী ফলাফলের গেজেট প্রকাশ হয় ভোটের প্রায় ২ মাস পর ৮ অক্টোবর। ওইদিন ঘোষণা হয় মেয়রসহ ৩০ কাউন্সিলরের ফলাফল।
বাকি ১০ কাউন্সিলরের ফলাফলের গেজেট হয় আরও পরে। সাংবিধানিক বিধিবিধান অনুযায়ী নগরভবনের বর্তমান পরিষদের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ২২ অক্টোবর। ২৩ অক্টোবর শূন্য হয়ে যাবে মেয়রের পদ। এর আগে ৪ অক্টোবর মেয়াদপূর্তির প্রায় ১ মাস আগেই পদত্যাগ করেন মেয়র বিএনপি নেতা আহসান হাবিব কামাল। নতুন মেয়র বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাদিক আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমার প্রো-পিতামহ ছিলেন রাজনীতিবিদ।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভগ্নিপতি আমার দাদা ১৫ আগস্টের শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত ছিলেন মন্ত্রী। আমার বাবা মন্ত্রী পদমর্যাদায় পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নবিষয়ক পরিবীক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ। আমার পরিবার যেমন পুরুষানুক্রমিকভাবে রাজনৈতিক পরিবার তেমনি শত্র“রাও আছে পুরুষানুক্রমিকভাবেই। রাজনীতিতে নেমেই বিনা কষ্টে আমি যা পেয়েছি তা হল শত্রু।
তবে আমি মনে করি প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি যেখানে রয়েছে সেখানে এটা হয়তো বড় কোনো ব্যাপার নয়। বর্তমান নির্বাচন কমিশন যে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষতার প্রমাণ হিসেবেই এই দেরি। নির্বাচনের পর ৫৭টি কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ নিয়ে অভিযোগ ওঠে। সেসব অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং ৯ কেন্দ্রে পুনঃভোট শেষ করেই তারা পূর্ণাঙ্গ ফলাফল ঘোষণা করেছে। এতে করে কমিশনের জবাবদিহিতার বিষয়টি আরেকবার প্রমাণ হল।’
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সোমবার সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত হবে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের (বিসিসি) নবনির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের শপথ। এ পর্যন্ত পাওয়া কর্মসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই শপথ পড়ানোর পর নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে যাবেন মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ।
সেখানে জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণের পর যাবেন গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জাতির জনকের মাজারে। দোয়া মোনাজাত শেষে অর্পণ করবেন পুষ্পমাল্য। সবশেষে বরিশালে এসে দায়িত্ব নেবেন মেয়র হিসেবে। নগরভবন সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, নতুন মেয়রকে উষ্ণ সংবর্ধনা দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে বঙ্গবন্ধু পরিষদ নগরভবন শাখা। আর এ দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে মেয়রের কাঁধে চেপে বসবে বিসিসির প্রায় সাড়ে ৩শ’ কোটি টাকার দেনা।
যদিও বিপুল অঙ্কের দেনা নিয়ে মেয়রের দায়িত্বে বসা এবারই প্রথম নয়। এর আগের মেয়ররাও একইভাবে দেনার বোঝা নিয়ে বসেছেন দায়িত্বে। তবে এবারের এই দেনার পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। সদ্য সাবেক মেয়র আহসান হাবিব কামাল যখন দায়িত্ব নেন তখন দেনার পরিমাণ ছিল দেড়শ’ কোটি টাকার কিছু বেশি। এর আগের মেয়র আওয়ামী লীগের শওকত হোসেন হিরনও প্রায় ১শ’ কোটি টাকার দেনা নিয়ে বসেছিলেন দায়িত্বে।
হিরনের সাড়ে ৪ বছরের দায়িত্ব পালনকালে রাজস্ব ও উন্নয়ন খাত মিলিয়ে প্রায় পৌনে ৩শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ পায় নগরভবন। সদ্য সাবেক মেয়র বিএনপি নেতা আহসান হাবিব কামালের সময়ে এ বরাদ্দ প্রায় ৩শ’ কোটি টাকা হলেও দেনার পরিমাণ না কমে বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৩শ’ কোটিতে। দায়িত্ব গ্রহণের পর সে দেনা পরিশোধই হবে নতুন মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
নগরভবনের হিসাব বিভাগ সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, দেনার মধ্যে উন্নয়ন খাতে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা ঠিকাদারদের পাওনার পরিমাণই প্রায় আড়াইশ’ কোটি টাকা। তাছাড়া অর্থের অভাবে বর্তমানে বহু প্রকল্পের কাজ বন্ধ রয়েছে। এছাড়া বহু বছর ধরে নগরভবনের কাছে মোটা অঙ্কের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগের। কেবল পানি শাখার কাছেই তাদের ওয়াটার জেনারেশন পাম্পগুলো পরিচালনার বিদ্যুৎ বিল বাবদ পাওনা প্রায় ২৩ কোটি টাকা।
২ মাসেরও বেশি সময় ধরে বেতন বকেয়া রয়েছে নগরভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। এর সঙ্গে সদ্য সাবেক মেয়র ও কাউন্সিলরদের সম্মানী ভাতাসহ মোট পাওনার পরিমাণ প্রায় ৭ কোটি। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, শুক্রবার শেষ হওয়া শারদীয় দুর্গোৎসবের আগ মুহূর্তে বকেয়া বেতন ও অন্য ভাতার অভাবে যখন ম্লান হচ্ছিল সনাতন ধর্মাবলম্বী নগরভবন কর্মীদের উৎসবের আনন্দ, ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা নেন নতুন মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ।
শপথ কিংবা মেয়রের দায়িত্বে না বসলেও তাদের সমুদয় পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা নেন তিনি। এছাড়া পরিবহনের জ্বালানি, স্টেশনারি ও অন্যান্য মিলিয়ে দেনার পরিমাণ যেখানে প্রায় সাড়ে ৩শ’ কোটি টাকারও বেশি সেখানে নগরভবনের উন্নয়ন এবং রাজস্ব খাত মিলিয়ে ব্যাংকে জমা আছে মাত্র ৬২ কোটি টাকা। অর্থাৎ তারপরও ৩শ’ কোটি টাকার পাওনাদার সামলাতে হবে নতুন মেয়রকে।
সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমাদের অভিভাবক জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অজানা কিছু নেই। বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের সমস্যা সম্পর্কেও তিনি অবশ্যই অবগত। আমার বিশ্বাস বরিশালের আপামর জনসাধারণের জন্য তিনি অবশ্যই এমন কোনো উদ্যোগ নেবেন যাতে নগরভবনের এই সমস্যা আর থাকবে না। তাছাড়া আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, সমুদয় দেনা পরিশোধ এবং নগরভবন স্বাবলম্বী না হওয়া পর্যন্ত মেয়র হিসেবে সম্মানী ভাতা নেব না।’
© স্বত্ব আর্থটাইমস্ ২৪.কম
প্রকাশক ও সম্পাদক: মোঃ জাকারিয়া আলম (দিপু)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ:বরিশাল-৮২০০।
আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:::
নিউজ মেইল:::
earthtimes24@gmail.com(নিউজ)
news@earthtimes24.com(নিউজ)
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত earthtimes24.com