সিদ্দিকুর রহমান ॥ ভীষন ধার্মিক আর নিরামিষাশী ছিল পিয়াস। প্রতিটা একাদশী পালন করতো। ঘুরতে খুব ভালোবাসতো। তাইতো সময় পেলে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতো সে। আর এই ঘুরার নেশা থেকেই এভারেস্ট দেখার ইচ্ছাই যে শেষ ইচ্ছা হবে কেইবা জানতো। মনেই করতেই পারছিনা প্রিয় বন্ধু পিয়াস আর নেই। বন্ধু ডাকটি যে আর কখনো শুনতে পাবো না তার মুখ থেকে। এমনি ভাবে স্মৃতিচারন করছিলেন বরিশাল জিলা স্কুলের ২০১০ ব্যাচের সহকর্মী বন্ধুরা।
বাকরুদ্ধ অশ্রুসিক্ত নয়নে শেষবারের মতো প্রিয় বন্ধু ও ছাত্রকে বিদায় জানাতে গতকাল শুক্রবার সকালে জিলাস্কুল প্রাঙ্গনে হাজির হয়েছিল স্কুল জীবনের সহপাঠী ও শিক্ষকবৃন্দ। বিদায় জানাতে এসে সবাই স্মৃতিচারন করছেন প্রিয়বন্ধু ও ছাত্রের সাথে জড়িয়ে থাকা নানাস্মৃতি। কেউ কেউ স্মৃতিচারন করতে গিয়ে কেঁদেই ফেলেছেন।
পিয়াসের বন্ধু রায়হানুল ইকবাল ইভান জানান, জিলা স্কুলের কৃতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে পিয়াস রায় ছিল অন্যতম। তাছাড়া সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিলো। পড়াশোনার পাশাপাশি বিতর্ক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেশ ভালো দখল ছিলো।
ইভান আরো জানায়, ২০১০ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে প্রথম হয়েছিল পিয়াস। সব বিষয়ে এতটাই দক্ষ ও পারদর্শী ছিল তাকে টপকানো অনেকটা কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। তাছাড়া গোপালগঞ্জের শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্র ছিল পিয়াস। তাইতো মেডিকেলের শেষ বর্ষের পরীক্ষা দিয়ে রওনা হয়েছিল নেপালে এভারেস্ট দেখতে। নেপালের এতটা কাছে গিয়েও দেখা হলোনা এভারেস্ট। শেষ করা হলো না এমবিবিএস কোর্স।
এসময় কান্নাজড়িত কন্ঠে ইভান বলেন, দুদিন পরে যে মানুষটা অসুস্থ মানুষের মুখে হাসি ফোটাতো, তার নিজের হাসিই আজ মুছে গেছে চিরতরে। এসময় তার আত্নার চির শান্তি কামনা করে ইভান।
এদিকে পিয়াসের আরেক বন্ধু সোয়েব মাহমুদ বলেন, পিয়াসের এই মৃত্যুতে আমরা বন্ধুমহল কতোটা দুঃখ পেয়েছি তা বলে বোঝোতে পারবো না। আমাদের সবথেকে প্রিয় বন্ধুটিকে হারিয়ে ফেলেছি। এর থেকে কস্টের আর কি থাকতে পারে।
পিয়াসের এই চলে যাওয়ায় শুধু বন্ধুরাই নয়, স্কুল জীবনের ছোট ভাইরা হারিয়েছে তাদের মেধাবি ও বন্ধুসুলভ ভাইকে। গতকাল তারাও হাজির হয়েছিল প্রিয় বড়ভাইকে শেষ বিদায় জানাতে।
জিলা স্কুলের ২০১১ ব্যাচের রিয়াম আহমেদ বলেছেন, জিলা স্কুলের টপ ছাত্র ছিল পিয়াস ভাই। প্রতি বছর ৩১ ডিসেম্বর রেজাল্টের দিনে প্রথম ৩ জনের মধ্যে একজন থাকতেন পিয়াস ভাই। তাই পুরো স্কুল জুড়েই তার নামটা ছিল সবার মুখে মুখে। এতটাই পরিচিত ছিল স্যাররাও প্রায়শই বলতেন পিয়াসদের ব্যাচ! আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। তার এই অকাল মৃত্যুতে সবাই গভীর ভাবে শোকাহত বলে জানায় রাইম। শুধু ইভান, সোয়েব কিংবা রিয়ামই নয়, আসিফ আলী, সামিনাজ হাসান জিয়ানদের মতো আরো অনেকেই প্রিয় বন্ধু পিয়াসকে চিরতরে হারিয়ে আজ তারা বাকরুদ্ধ।
এদিকে প্রিয় শিক্ষার্থীর শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসে আবেগাপ্লুত বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, পিয়াস সুন্দর আচার-ব্যবহারের অধিকারী ছিলো। তাছাড়া বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষক এবং ছাত্রদের মনে স্থান করে নিয়েছিল সে। তার এভাবে চলে যাওয়া ভাবতেই পারছিনা। আমরা তার এ মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত।
এর আগে সকাল ৮টার দিকে পিয়াসের মরদেহবাহী গাড়িটি নগরীর এম এ গফুর সড়কের বাসা থেকে স্কুল প্রাঙ্গনে এসে পৌছায়। স্কুলমাঠে গাড়িটি পৌঁছলে কফিন দেখেই কাঁদতে থাকেন শিক্ষক ও সহপাঠীরা। এসময় মরদেহবাহী গাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের সহপাঠীরাই হাতে হাতে কফিনটি নামিয়ে কিছুক্ষণের জন্য বিদ্যালয়ের প্যারেড গ্রাউন্ডে রাখেন। পরে সেখানে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে চিরতরে বিদায় দেন প্রিয় বন্ধু ও ছাত্র পিয়াস রায়কে।
পিয়াসের মরদেহবাহী গাড়ির সঙ্গে পিয়াসের বাবা সুখেন্দু বিকাশ রায়ও আসেন ছেলের এ বিদ্যালয়টিতে। ছেলে হারানোর শোকে মূহ্যমান বাবা খানিক সময়ের জন্য সহপাঠী ও শিক্ষকদের পাশে দাড়িয়ে থাকনে অশ্রুজল নয়নে। পরে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বরিশালের মহাশ্মাশানে নেওয়া হয় পিয়াস রায়ের মরদেহ। সেখানে পিয়াসের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। উল্লেখ্য, গত ১২ মার্চ নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলার ফ্লাইট বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত হন পিয়াস রায় ।