প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক হিসাব খুলতে ভ্যাট নিবন্ধন বা বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। শুধু তাই নয় বিআইএনের বিপরীতে প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলও করতে হবে। লক্ষ্য কর জাল বৃদ্ধি করা।
আসন্ন ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে এমন বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
এনবিআরের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স থাকলেও ভ্যাট নিবন্ধন নেই, তাদের করের আওতায় আনতে এমন বিধান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আগামী জাতীয় বাজেটে এ বিষয়ে বিধান অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে৷ এই নীতি পুরোপুরি কার্যকর হলে হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধন নিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভ্যাট প্রদানে জটিলতা ও হয়রানির কারণে অনেক ব্যবসায়ী নিবন্ধন নিতে অগ্রহী হন না। আবার অনেকে ভ্যাট ফাঁকি দিতে নিবন্ধন করছে না, আবার নিবন্ধন নিলেও রিটার্ন দেন না। আমাদের উদ্দেশ্য মানুষ যাতে সিস্টেমের সঙ্গে অটোমেটিকভাবে যুক্ত হতে বাধ্য হন।’
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ভ্যাটের আওতায় আসার কথা থাকা সত্ত্বেও অনেক ব্যবসায়ী এখনও নিবন্ধনের বাইরে রয়েছেন। অর্থমন্ত্রীর অনুমোদন পেলে বাজেটে বিধানটি অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে এবং সেক্ষেত্রে আগামী অর্থবছর থেকে কার্যকর হবে। এছাড়া, বিদ্যমান হিসাবধারী ব্যবসায়ীদেরও ব্যাংক হিসাব চলমান রাখতেও বিআইএন যাচাই বাধ্যতামূলক হতে পারে। নতুন এ উদ্যোগের ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিচয় যাচাই, ভ্যাট ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ এবং রাজস্ব নজরদারি আরও কার্যকর হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এনবিআরের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে ভ্যাট নিবন্ধনধারী বা বিআইএনের সংখ্যা আট লাখ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে রিটার্ন জমা হয় পাঁচ লাখের মতো। অথচ বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশের ট্রেড লাইসেন্সধারী দোকানের সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। ব্যবসায়ীদের ভ্যাটের আওতায় আসার অনীহার মূল কারণ জটিলতা এবং হয়রানি।
ভ্যাট বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে ব্যাংক হিসাব, ভ্যাট নিবন্ধন ও ট্যাক্স শনাক্তকরণ তথ্যকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত লেনদেন যাচাই, রিটার্ন দাখিল পর্যবেক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ আর্থিক কার্যক্রম শনাক্ত করা আরও সহজ হবে। তবে, নতুন নিয়ম বাস্তবায়নের আগে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ নিবন্ধন প্রক্রিয়া ও পর্যাপ্ত সচেতনতা জরুরি।
২০১৯ সালের জুলাই মাসে নতুন ভ্যাট আইন চালু হওয়ার পর ইলেকট্রনিক বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (ইবিআইএন) নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। ওই নিবন্ধন ছাড়া ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়া যায় না। নিবন্ধন নিয়ে প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যবাধকতার রয়েছে।
বর্তমানে এনবিআরের অধীন সারা দেশে ভ্যাট কমিশনারেট অফিস রয়েছে ১২টি। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় পাঁচটি। রাজস্ব আদায় বাড়াতে নিবন্ধিত সব ভ্যাটযোগ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলক অনলাইনের আওতায় আনা হচ্ছে। আগে প্রচলিত প্রথায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন দেওয়া হতো। যার অঙ্ক বা ডিজিট ছিল ১১। তিন বছর আগে অনলাইনে যে ভ্যাট নিবন্ধন চালু করা হয় তার ডিজিট ৯। এখন ৯ ডিজিটের নাম্বারকে বলা হয় বিজনেস আইডেনটিফিকেশন নাম্বার বা বা ই-বিআইএন। মাসিক ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে হলে ৯ ডিজিটের ই-বিআইএন অবশ্যই উল্লেখে করতে হয়। তা না হলে রিটার্ন গ্রহণ করা হয় না। রিটার্নের ওপর ভিত্তি করেই ভ্যাট আদায় করা হয়। রিটার্নে প্রতিষ্ঠানের বিক্রি বা লেনদেনের তথ্য উল্লেখ করা হয়।
নতুন ভ্যাট আইনে কোনো প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক লেনদেন ৫০ লাখ টাকার কম হলে ভ্যাট দিতে হয় না। তাই তাদের নিবন্ধনও নেওয়ার দরকার নেই। তবে, বার্ষিক লেনদেন ৫০ লাখ টাকা থেকে তিন কোটি টাকা হলে ৪ শতাংশ টার্নওভার কর দিতে হয়। বাকিদের ক্ষেত্রে নিয়মিত ভ্যাটহার প্রযোজ্য। টার্নওভার কর ও নিয়মিত ভ্যাট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে ইবিআইএন নিতে হয়। কোনো প্রতিষ্ঠান ইবিআইএন না নিলে তাদের ১০ হাজার টাকা জরিমানা করার বিধান রয়েছে।
