দেশে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব দূরীকরণ এবং নতুন ও তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। তরুণদের জন্য বর্তমানে বিনা সুদে কোনো ঋণ প্রকল্প চালু না থাকলেও, সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে অর্থায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন স্কিম পরিচালনা করছে। এর আওতায় নতুন উদ্যোক্তারা কোনো জামানত ছাড়াই সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন। একই সাথে স্টার্টআপ খাতের বিকাশ এবং উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নামমাত্র সুদে ঋণ ও ইক্যুইটি সহায়তার পাশাপাশি বিনামূল্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ এবং প্রশিক্ষণ ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (০৯ জুন) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রশ্নোত্তর পর্বে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল মালিকের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী দেশের নতুন এবং স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারের নেওয়া বহুমুখী অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার চিত্র তুলে ধরেন। সংসদ সদস্য তার প্রশ্নে তরুণ উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ও সম্পূর্ণ বিনা সুদে ঋণ প্রদানের কোনো প্রকল্প সরকারের বিবেচনায় আছে কি না, তা জানতে চেয়েছিলেন।
সংসদ অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী জানান, দেশের কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র খাতে নতুন উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের গতি বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত ‘নতুন উদ্যোক্তা পুনঃঅর্থায়ন স্কিম’-এর পরিধি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই স্কিমের তহবিলের পরিমাণ পূর্বে নির্ধারিত ১০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে এখন ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এই বর্ধিত তহবিল থেকে নতুন উদ্যোক্তারা অত্যন্ত সহজ শর্তে এবং বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন। তবে কোনো উদ্যোক্তা যদি প্রয়োজনীয় জামানত প্রদানে সক্ষম হন, তবে তার জন্য এই একই স্কিমের আওতায় সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো জামানতের অভাবে যেন কোনো সম্ভাবনাময় কটেজ বা ক্ষুদ্র শিল্প থমকে না যায়।
প্রচলিত ব্যবসার পাশাপাশি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনী স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার বিষয়টিও সরকার গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে।
অর্থমন্ত্রী সংসদকে জানান, তরুণ স্টার্টআপদের জন্য ‘স্টার্ট আপ ফান্ড’ নামে ৫০০ কোটি টাকার আরও একটি পৃথক পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে। এই বিশেষ তহবিল থেকে উদ্যোক্তারা মাত্র ৪ শতাংশ নামমাত্র সুদে ঋণ সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। শুধু স্বল্প সুদের ঋণ দিয়েই সরকার ক্ষান্ত হচ্ছে না; স্টার্টআপ খাতের সামগ্রিক টেকসই বিকাশের লক্ষ্যে উদ্যোক্তাদের অনুকূলে ইক্যুইটি বা মূলধনী সহায়তা প্রদানের জন্য একটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যক্ষ উদ্যোগে এবং দেশের ৩৯টি তফসিলি ব্যাংকের যৌথ অংশীদারিতে ইতোমধ্যে ‘বাংলাদেশ স্টার্ট-আপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি পিএলসি’ নামক একটি স্বতন্ত্র ইক্যুইটি ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। দেশের সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ উদ্যোগগুলো এখন এই প্রাতিষ্ঠানিক কোম্পানি থেকে সরাসরি আর্থিক ও ইক্যুইটি সহায়তা গ্রহণ করে তাদের ব্যবসার পরিধি বাড়াতে পারবে।
অর্থনৈতিক সহায়তার পাশাপাশি সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার জন্য তরুণদের দক্ষ ও যোগ্য করার ওপর জোর দিচ্ছে সরকার।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, ‘স্কিলস ফর ইন্ডাস্ট্রি কম্পিটিটিভনেস অ্যান্ড ইনোভেশন প্রোগ্রাম (এসআইসিআইপি)’-এর অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংকের পিআইইউ-এসআইসিআইপি কর্তৃক পরিচালিত ‘অন্টাপ্রেনারশিপ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইডিপি)’-এর মাধ্যমে দেশজুড়ে নিবিড় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এই প্রোগ্রামের আওতায় দেশের বিভিন্ন জেলায় সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণীদের মাসব্যাপী মোট ১০০ ঘণ্টার একটি পেশাদার উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। এই সরকারি প্রকল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, এখানে প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য উদ্যোক্তাদের কোনো প্রকার ফি বা কোর্স ফি দিতে হয় না, অর্থাৎ এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হচ্ছে। উল্টো, কোনো প্রশিক্ষণার্থী সফলভাবে এই ১০০ ঘণ্টার কোর্স সম্পন্ন করতে পারলে তাকে সরকারের পক্ষ থেকে ৫ হাজার টাকা নগদ প্রশিক্ষণ ভাতা বা সম্মানী প্রদান করা হচ্ছে। একই সাথে, এই প্রশিক্ষণ সফলভাবে শেষ করা দক্ষ উদ্যোক্তারা পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল থেকে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার বা প্রিফারেন্স লাভ করবেন, যা তাদের ব্যবসায়িক যাত্রা দ্রুত শুরু করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।
