চন্দ্রশেখর থেকে থালাপতি, বিজয়ের গল্প যেন স্বপ্নের মতই

লেখক:
প্রকাশ: ১ ঘন্টা আগে

আজ ২২ জুন, ৫২ বর্ষা পেরিয়ে ৫৩-তে পা রাখলেন দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার সুপারসটার থালাপতি বিজয়। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ৭৮টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। বাবা প্রখ্যাত নির্মাতা এস এ চন্দ্রশেখরের হাত ধরে শিশুশিল্পী হিসেবে পর্দায় আগমন বিজয়ের। তিন দশক পেরিয়ে কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া বিজয় শুধু সিনেমার নায়কই নন, হয়ে উঠেছেন বাস্তব জীবনে জনতার নায়কও। আজ তাই বিশেষ দিনে সিক্ত হচ্ছেন ভক্ত, শুভাকাঙ্ক্ষী, সতীর্থদের ভালোবাসা ও শুভেচ্ছায়। 

অতীত এবং প্রাথমিক জীবন

১৯৭৪ সালের ২২ জুন তামিলনাড়ুর চেন্নাইতে জন্মগ্রহণ করেন বিজয়। পুরো নাম সি. জোসেফ বিজয় বা জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর। তার বাবা চলচ্চিত্র নির্মাতা এস এ চন্দ্রশেখর এবং মা গায়িকা শোভা চন্দ্রশেখর। উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে স্নাতকে ভর্তি হয়েছিলেন বটে। কিন্তু চলচ্চিত্রপ্রেমে মজে পড়াশোনা ছেড়ে দেন।

সিনেমায় আসা ও শুরুর দিকের সংগ্রাম

১৯৮০-এর দশকে বাবা এস এ চন্দ্রশেখরের পরিচালনায় ‘ভেত্রি’, ‘কুদুমবাম’ ও ‘বসন্ত রাগম’-এর মতো সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসেবে বিজয় তার অভিনয় জীবন শুরু করেন। ১৯৯২ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ‘নালাইয়া থিরপু’ সিনেমার মাধ্যমে প্রধান নায়ক হিসেবে তার অভিষেক ঘটে।

তবে শুরুটা সহজ ছিল না, প্রথম সিনেমাটি বক্স অফিসে ব্যর্থ হয় এবং সমালোচকদের কাছ থেকে অত্যন্ত রূঢ় ও হতাশাজনক মন্তব্য পান তিনি। এরপর ১৯৯৬ সালে ‘পুভে উনাক্কাগা’ সিনেমার মাধ্যমে মূলধারার চলচ্চিত্রে তার সাফল্য আসে। ছবিটি তামিলনাড়ুর পারিবারিক দর্শকদের মাঝে তাকে তুমুল জনপ্রিয় করে তোলে। ১৯৯৭ সালে ‘কাধালুক্কু মারিয়াধাই’ তার রোমান্টিক হিরো ইমেজকে আরও উঁচুতে নিয়ে যায় এবং তার নাচের অনন্য স্টাইল ও চার্ম তরুণদের হৃদয়ে ঝড় তোলে।

চন্দ্রশেখর থেকে ‘থালাপতি’ হয়ে ওঠা

তামিল ভাষায় ‘থালাপতি’ শব্দের অর্থ হলো সেনাপতি, কমান্ডার, নেতা বা প্রধান। ১৯৯৪ সালে ‘রসিগান’ সিনেমার সাফল্যের পর ভক্তরা তাকে ‘ইলাইয়া থালাপতি’ বা তরুণ সেনাপতি বলে ডাকতে শুরু করেন। ২০০০-এর দশকের শুরুতে ‘থিরুমালাই’ (২০০৩) এবং ‘ঘিল্লি’ (২০০৪) সিনেমার মাধ্যমে তার ক্যারিয়ারে এক বিশাল রূপান্তর ঘটে, যা তাকে মাস অ্যাকশন সুপারস্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এরপর ‘পোক্কিরি’ (২০০৭) এবং ‘থুপ্পাক্কি’ (২০১২)-এর মতো অল-টাইম ব্লকবাস্টার উপহার দেওয়ার পর ভক্তরা তাকে কেবল ‘থালাপতি’ নামে সম্বোধন করতে শুরু করে। ২০১৭ সালে ‘মেরসাল’ সিনেমা মুক্তির সময় থেকে পুরো ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ও ভক্তমহলে এই উপাধিটি তার পরিণত সুপারস্টারডম ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।

সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে প্রভাব 

দীর্ঘ অভিনয় জীবনে ‘মাস্টার’, ‘লিও’ কিংবা ‘গোট’ (GOAT)-এর মতো অসংখ্য ব্লকবাস্টার উপহার দিয়ে তামিল সিনেমার সমার্থক হয়ে উঠেছেন বিজয়। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের কাছে তার সততা ও নম্রতা অনন্য দৃষ্টান্ত। তামিলনাড়ু ফিল্ম প্রডিউসার কাউন্সিলের সদস্য ও প্রযোজক জি ধনঞ্জয়ন তাকে বিশ্ব চলচ্চিত্র শিল্পের একটি অনন্য ‘ফেনোমেনন’ বা বিস্ময় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, বিজয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছেন যেখানে রাজনীতিতে আসার বহু আগেই তিনি তামিলনাড়ুর প্রতিটি ঘরের একটি অংশ হয়ে উঠেছিলেন। সহকর্মী ও টেকনিশিয়ানদের সাথে তার দীর্ঘ কয়েক দশকের বন্ধুত্ব ইন্ডাস্ট্রিতে তার চমৎকার ব্যক্তিত্ব ও সুনামের প্রমাণ দেয়।

রূপালী পর্দা থেকে রাজনীতির ‘থালাপতি’

চলচ্চিত্রের এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই ২০২৪ সালে বিজয় ‘তামিলাগা ভেটরি কাজাগাম’ (টিভিকে) নামে নিজের রাজনৈতিক গঠন করেন। সিনেমার পর্দার মতো রাজনীতির মাঠেও তিনি দেখিয়েছেন ম্যাজিক। দল গঠনের মাত্র দুই বছরের মাথায় তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে তার দল ১০৮টি (মতান্তরে ১০৭টি) আসনে জয়লাভ করে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন; হয়ে ওঠেন সত্যিকারের জনতার নায়ক। চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারের ইতি টেনে জনগণের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে প্রমাণ করেছেন, তিনি শুধু সিনেমার পর্দাতেই নয়, বাস্তব জীবনেও তামিলনাড়ুর কোটি মানুষের সত্যিকারের ‘থালাপতি’ বা নেতা।