কৌতূহলী বরিশালবাসি বিসিসি নির্বাচনে আ’লীগ বিএনপিতে কে আসছেন টিকিট নিয়ে !

লেখক:
প্রকাশ: ৭ years ago

এ .এম জুয়েল ॥বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) নির্বাচনে কে হচ্ছেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী? এ প্রশ্ন এখন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। সবারই কৌতূহল, শেষ পর্যন্ত কাকে মনোনয়ন দেবে ক্ষমতাসীন দল। ইতমধ্যে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের তফসিল ঘোষানা করেছেন। সে অনুযায়ী আগামী ৩০ জুলাই বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ভোট গ্রহন অনুষ্ঠিত হবে।

তবে বড় দুই জোট এখনও তাদের প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। বরিশাল জেলা নির্বাচন অফিস সুত্র বলেছে, ৩০ জুলাই বিসিসি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে তারা এখনও দাফতরিক নির্দেশনা পাননি। তবে নির্বাচন কমিশনের উপ-সচিব ফরহাদ হোসেন জানান, মঙ্গলবার নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আগামী ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ বিষয়ে প্রযোজ্য তফসিল ১৩ জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে। প্রতীক বরাদ্দের আগ পর্যন্ত কোনও প্রার্থী নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না। ফরহাদ হোসেন জানান, নির্বাচন কমিশনের মঙ্গলবারের বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৩ থেকে ২৮ জুন মনোনয়নপত্র জমা, ১ ও ২ জুলাই মনোনয়নপত্র বাছাই, ৩ থেকে ৫ জুলাই আপিল, ৬ থেকে ৮ জুলাই আপিলের নিষ্পত্তি, ৯ জুলাই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার এবং ১০ জুলাই প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে।

নারীদের জন্য সংরক্ষিত ১০টি এবং ৩০টি সাধারণ ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত বরিশাল সিটি করপোরেশনের আয়তন ৫৮ বর্গ কিলোমিটার। ৫ লাখ নাগরিকের বাস এই নগরীতে। নির্বাচন অফিস প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুসারে বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় ভোটার ২ লাখ ৪৪ হাজার ১০২ জন। এদিকে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন (বিসিসি) নির্বাচনকে সামনে রেখেই অনেক আগ থেকে নিজেকে মেয়র প্রার্থী ঘোষনা দিয়ে প্রচার প্রচারনা চালিয়ে যাচ্ছে বরিশাল মহানগর আ’লীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ। ইতমধ্যে বরিশাল আওয়ামীলীগকে একত্রিত করে সফলভাবে নিয়ন্ত্রন করছেন এই নেতা। যুব বান্ধব বলে আখ্যায়িত সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ এ বছর বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মনোনয়ন পাবেন এমন ধারনা দলের নেতাকর্মীসহ নগর বাসীর মধ্যে। উদিয়মান সাদিক আব্দুল্লাহকে যুব সমাজ বেশী পছন্দ করে বলে ধারনা করা হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত আওয়ামীলীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে সোনার টিকিটটি আনতে পারবেন কিনা সাদিক সেটাই এখন দেখার বিষয়।

অপর দিকে বিসিসি’র নির্বাচনকে সামনে রেখে ভেতরে ভেতরে অনেক আগে থেকেই নিজের নাম লিখয়েছেন কর্নেল জাহিদ ফারুক শামীম। সোনার সেই টিকিট নাকি জাহিদ ফারুক শামীমই পাচ্ছে এমন গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে মানুষের মুখে মুখে। তবে কে পাবে ক্ষমতাশীন দলের টিকিট সেটাই দেখার বিষয়। ক্লিন ইমেজ ও সাংগঠনিক নেতা হিসেবে বরিশালে সুপরিচিত থাকার ফলে দলীয় মনোনয়নের টিকিট তিনিই পাবেন এমন ধারনা অনেকের। বার বার নিরাশ হওয়া জাহিদ ফারুক শামিমকে এবার আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হতে পারে বলে ধারনা করছে দলের নেতাকর্মীরা। কেন্দ্রীয় সূএে জানা যায় আগামী নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা চাচ্ছেন বরিশাল সিটিতে একজন সৎ যোগ্য ত্যাগী ও শিক্ষিত মেয়র। এক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি দলীয় অবস্থানের বিষয়টি অতি গুরুত্বের সাথে দেখছেন তিনি।

২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৫ (সদর) আসনের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন শামিম। ওই সময় তিনি (শামিম) বরিশালের ইতিহাসে আওয়ামী লীগের পক্ষে সর্বোচ্চ ৯৯ হাজার ৬২৪ ভোট পেয়েছিলেন। এ সফলতাকে কাজে লাগিয়ে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়ে মেয়রের আসনে বসছেন সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা তা এখন টক অফ টা টাউনে পরিনত হয়েছে। উল্লেখ্য,বরিশাল সিটি করপোরেশনের তৃতীয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৩ সালের ১৫ জুন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী শওকত হোসেন হিরণকে ১৭ হাজার ১০ ভোটে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী আহসান হাবিব কামাল। তিনি পেয়েছিলেন ৮৩ হাজার ৭৫১ ভোট।একই বছর ৮ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়রের দায়িত্ব নেন কামাল। সিটি করপোরেশন আইন অনুযায়ী ৫ বছর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার তিন মাস আগে তিন প্যানেল মেয়রের একজন ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পাবেন। এই সময়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশন পরবর্তী সিটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবেন। বর্তমানে বরিশাল সিটি করপোরেশনে ভোটার রয়েছেন দুই লাখ ৩৭ হাজার ৬০৭ জন।

বিসিসির নির্বাচনকে সামনে রেখে ভেতরে ভেতরে অনেকটাই লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়েছেন যুবলীগ নেতা মাহমুদুল হক খান মামুন। প্রতিবছরই তিনি বরিশাল সিটি কর্পোরেশেন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী পদে লড়াই করেন। কিন্তু দলীয় মনোনয়ন কোন বাররি জোটেনি তার কপালে। তাই দলের বাইরে গিয়েই নির্বাচন করতে হয় তাকে। প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও তিনি মেয়র প্রার্থী। একক ভাবে নির্বাচন করেও আশানুরুপ ফলাফল করতে পারেনি তিনি। এদের বাইরে আওয়মীলীগের আর কোন প্রার্থী না থাকায় আওয়ামীলীগকে নিয়ে গুঞ্জনটা একটু কম। বরিশালকে বিএনপির ঘাটি বলা হয়। আর সেক্ষেত্রে বিএনপির প্রার্থীও বেশী । আগামী একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বরিশাল সিটি নির্বাচন নিয়ে ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে বিএনপির রাজনৈতিক উত্তেজনা। কাকে দল থেকে মনোনয়ন দেয়া হবে তা নিয়ে চলছে কানাঘুষা। এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচীব ও বরিশাল মহানগর বিএনপির সভাপতি এ্যাড: মজিবর রহমান সরোয়ার বলেছিলেন , দল থেকে যদি তাকে মনোনয়ন প্রদান করা হয় তবে তিনি নির্বাচন করবেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সরোয়ার এমপি নির্বাচনে আগ্রহী। কেন্দ্রীয় সিধান্ত মোতাবেক বিসিসির নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হবেন বলেও তিনি জানিয়েছিলেন। তবে সরোয়ার ছাড়াও বিসিসি’র নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হিসেবে রয়েছে জেলা বিএনপির সভাপতি এবায়দুল হক চাঁন, এ্যাড. বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন। এদিকে জাতীয় পার্টি (জাপা) থেকে একাধিক প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। জানাযায়, বিসিসির টানা ৪ বার নির্বাচিত কাউন্সিলর একেএম মরতুজা আবেদীনই মেয়র প্রার্থী ।

এছাড়াও কেন্দ্রীয় জাপা’র ভাইস চেয়ারম্যান ও জেলা জাপা’র আহ্বায়ক অধ্যাপক মহসিন উল ইসলাম হাবুল ও সদর উপজেলা জাপা’র আহ্বায়ক বশির আহমেদ ঝুনুও প্রার্থী হচ্ছেন। আসন্ন বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে বরিশাল জেলা কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি এ.কে আজাদকে দলীয়ভাবে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। ইতমধ্যে তিনি প্রচার প্রচারনাও শুরু করেছেন্ তবে শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকবেন কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) নির্বাচনে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) হয়ে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ডা. মনিষা চক্রবর্তী। গত ৫ ডিসেম্বর বাসদের নেতৃবৃন্দ এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন । বরিশালবাসীর আস্থা, ভরসা, ভালোবাসা এবং নগরবাসীর অধিকার আদায়ের প্রত্যয় নিয়েই বাসদের নেতারা আগামী বরিশাল সিটি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মনিষা চক্রবর্তী। বিসিসি’র বিগত ৩টি নির্বাচনে কোনো নারী মেয়র প্রার্থী হননি। আগামী বছরের মাঝামাঝিতে অনুষ্ঠিতব্য চতুর্থ নির্বাচনে অন্য কোনো নারী প্রার্থী না হলে ডা. মনিষা হবেন বিসিসি’র ইতিহাসে প্রথম নারী মেয়র প্রার্থী।

উল্লেখ ২০০১ সালের ৪ এপ্রিল ‘বরিশাল সিটি করপোরেশন আইন’ পাস হওয়ার পর ২০০২ সালের ২৫ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে সিটি করপোরেশন হিসেবে বরিশালের যাত্রা শুরু হয়। ২০০৩ সালে ২০ মার্চ বিসিসি’র প্রথম নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপি’র বর্তমান কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব, মহানগর সভাপতি ও সাবেক হুইপ মজিবর রহমান সরোয়ার। তবে তার মেয়াদপূর্তির আগেই ওয়ান-ইলেভেনের সেনাসমর্থিত সরকারের সময় তিনি গ্রেফতার হন। ২০০৮ সালের ৪ আগস্ট বিসিসি’র দ্বিতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শওকত হোসেন হিরন মাত্র ৬ শতাধিক ভোটের ব্যবধানে বিএনপি প্রার্থী সরফুদ্দিন আহমদ সেন্টুকে পরাজিত করেন। এরপর আওয়ামী লীগের প্রার্থী শওকত হোসেন হিরনকে হারিয়ে ২০১৩ সালের ১৫ জুনের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী আহসান হাবিব কামাল (আনারস) মেয়র নির্বাচিত হন। গত নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ১১ হাজার ২৫৭ জন (১ লাখ ৩ হাজার ৬৩২ জন নারী এবং ১ লাখ ৭ হাজার ৬২৫ জন পুরুষ)। ওই নির্বাচনে মেয়র পদের জন্য ৩ জন, ১০টি সংরক্ষিত মহিলা আসনের জন্য ৪৫ জন এবং ৩০টি সাধারণ কাউন্সিলর আসনের জন্য ১১৬ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।