পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং শিক্ষক কর্মচারীদের টানা আন্দোলনের মুখে অবশেষে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক পদ থেকে অধ্যাপক এহতেসাম উল হককে সরিয়ে দিয়েছে সরকার।
নিয়োগের ২০ দিনের মাথায় তাকে এ পদ থেকে সরানো হলো। নতুন ডিজি হিসেবে পদায়ন পেয়েছেন জামালপুরের সরকারি আশেক মাহমুদ সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ আজাদ খান।
বুধবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের প্রজ্ঞাপনে এহতেসাম উল হককে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। এতে সই করেছেন উপসচিব মো. মাহবুব আলম। অন্য আরেকটি আদেশে নতুন মহাপরিচালক হিসেবে আজাদ খানকে প্রদান করা হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. মো. এহতেসাম উল হককে পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিজ বেতন ও বেতনক্রমে মাউশির বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পদে বদলি/পদায়ন করা হলো।
গত ৩০ জানুয়ারি পটুয়াখালী সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক এহতেসাম উল হককে মাউশির মহাপরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে ২ ফেব্রুয়ারি। তার নিয়োগের খবর জানাজানির পর তুমুল সমালোচনার ঝড় উঠে।
ক্ষোভ জানান শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারাও। একপর্যায়ে তাকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিতে কয়েক দফায় বিক্ষোভ, সমাবেশ ও শিক্ষাভবন ঘেরাও কর্মসূচি করেন শিক্ষক ও কর্মচারীরা।
তার পদায়নে ক্ষুব্ধ হয়ে রোববার (২ ফেব্রুয়ারি) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব সিদ্দিক জোবায়েরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের অর্ডার বাতিলের দাবি জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও নাগরিক কমিটির সদস্যরা। অন্যথায় সোমবার (৩ ফেব্রুয়ারি) মাউশি অধিদপ্তর ও নায়েম ঘেরাও করবেন বলে হুমকি দেন তারা। এসময় সচিবের সঙ্গে তাদের বাগবিতাণ্ডা হয়। উত্তেজিত হয়ে চুক্তিভিত্তিতে আসা সচিব বলেন, এমন হলে আমি চলে যাব।
সরজমিনে দেখা যায়, দুপুর ২টার পর সচিবের রুমে প্রবেশ করেন নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন সমন্বয়ক। তারা মাউশি ও নায়েমের ডিজির পদায়নের বিষয়ে জানতে চান। সচিব জানান, এ দুইজনের আদেশ হওয়ার আগে দুই কর্মকর্তার কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত তথ্য, একাডেমিক ফলাফল সংগ্রহ করে ফাইল তোলা হয়। এরপর উপদেষ্টার সম্মতির পাওয়ার পর দুটি গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে তাদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সেখানে তারা আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ছিলেন এমন কোনো তথ্য আসেনি। সচিব তাদের আরও জানান, এখানে আমি সাচিবিক দায়িত্ব পালন করেছি। কোনো তথ্যে যদি গ্যাপ থাকে সেটি উপদেষ্টাকে জানানো হবে। তিনিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। তিনি চাইলে তাদের অর্ডার বাতিল করতে পারেন।
এহতেসাম উল হকের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ডিজি পদে পদায়ন পাওয়া এহতেসাম উল হক বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর ঘনিষ্ঠ অনুচর হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত। সাদিক আব্দুল্লাহর হাত ধরেই বরিশাল বি এম কলেজের রসায়ন বিভাগ থেকে বরিশাল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ পদে পদায়ন পান তিনি।
তারা আরও অভিযোগ করেন, আওয়ামী বলয়ের প্রভাবশালী অধ্যক্ষ হওয়ায় ক্ষমতার দাপটে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ লোপাট, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারসহ বিস্তর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
৫ আগস্টের পরে অধ্যক্ষ পদ থেকে প্রত্যাহারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিক আন্দোলন, আলটিমেটাম এবং শিক্ষা সচিবের লিখিত অভিযোগ দেন। এরপরই তাকে অধ্যক্ষ পদ থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। আওয়ামীঘনিষ্ঠ ও বিতর্কিত শিক্ষা ক্যাডারের এ কর্মকর্তা কীভাবে মাউশির ডিজির পদে আসীন হন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তারা।