মোর্শেদা আপার বৈকালী পাঠশালা

লেখক:
প্রকাশ: ৮ years ago

কারও হাতটা বাঁকা, কারও পা, কেউ আছে ঠিক করে কথা বলতে পারে না, আবার কেউ হাঁটতে পারে না, কেউবা আবার খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আসে। এসবের পরও আরও কয়েকজন আছেন, যারা মা-বাবার কোলে করে বৈকালিক স্কুলে আসেন শিক্ষার আলোয় আলোকিত হতে। শারীরিক অঙ্গের আঙ্গিকতা না থাকলেও তাদের মধ্যে ইচ্ছাশক্তি আছে অদম্য। অদম্য এই প্রতিবন্ধীরা শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। দারিদ্র্যের কষাঘাত তাদের এই অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। আর তাদের আলোকিত পথের যাত্রী করে তুলছেন আরেক অদম্য নারী মোর্শেদা আপা। জানা যায়, বগুড়ার ধুনট উপজেলার চৌকিবাড়ী গ্রামের মোর্শেদা হককে সবাই মোর্শেদা আপা করে ডাকেন। মোর্শেদা হকের চেয়ে মোর্শেদা আপা বললে এ গ্রামের মানুষ তাকে দ্রুত চিনতে পারেন। মোর্শেদা একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করছেন স্বাস্থ্য নিয়ে। অথচ তার জন্ম গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের মহিমাগঞ্জের শ্রীপতিপুর গ্রামে। তার বাবা অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য মোজাম্মেল হক।

মোর্শেদা হক চাকরির সূত্রে থাকেন ধুনট উপজেলা সদরের প্রফেসরপাড়ার ভাড়াবাড়িতে। তিনি প্যারামেডিকেল কোর্সে অধ্যয়নরত। নিজ দায়িত্ব পালনকালে চৌকিবাড়ী এলাকায় তিনি দেখতে পান ৪০ জনেরও বেশি প্রতিবন্ধী। যারা একদিকে যেমন দরিদ্র তেমনি সাক্ষরজ্ঞানও তাদের নেই। দিন যাচ্ছে বড় হচ্ছে আর দরিদ্র পরিবারে প্রতিবন্ধী মানুষগুলো বোঝা হয়ে ভার বাড়াচ্ছে। তাদের নিয়ে কিছু করার চিন্তা করেন মোর্শেদা হক। চিন্তায়-চেতনায় তিনি তাদের শিক্ষাদান করতে উঠেপড়ে লাগেন। গ্রামের কিছু তরুণ ও বয়স্কদের একত্র করে তিনি প্রথমে গড়ে তোলেন ‘উজ্জীবিত প্রতিবন্ধী উন্নয়ন’ নামের একটি ক্লাব। এ ক্লাবের লোকজনের সহযোগিতা নিয়ে ধুনট উপজেলার চৌকিবাড়ী গ্রামে দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত সুবিধাবঞ্চিত প্রতিবন্ধীদের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে ২০১৫ সালের ১৫ মার্চ বৈকালী পাঠশালা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেন বেসরকারি উন্নয়ন কর্মী মোর্শেদা হক। নিজ দায়িত্ব পালন শেষে বিকালে প্রতিবন্ধী শিশু ও বয়স্কদের শিক্ষাদান শুরু করেন। বিকালে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করেন বলে স্কুলঘরটির নাম দেওয়া হয় ‘বৈকালী পাঠশালা’।

প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি প্রতিবন্ধীদের অক্ষরজ্ঞান দানের পাশাপাশি একাডেমিক পাঠদান করে যাচ্ছেন। পাঠশালায় স্বেচ্ছায় স্বাক্ষর শেখানোসহ প্রতিবন্ধীদের পরিবেশ, পুষ্টি, খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিষয়ে পাঠ দান করা হয়। প্রতিবন্ধীরা সমাজের জন্য যেন বোঝা হয়ে না দাঁড়ায় সে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সামনে রেখে প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন মোর্শেদা হক। মোর্শেদা আপার বৈকালী পাঠশালায় শিক্ষা গ্রহণ করে অনেকেই এখন স্বাক্ষর করতে পারে, পড়তে পারে, লিখতে পারে। এমন আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী আছেন, যারা লেখাপড়া বাদ দেওয়ার পর মোর্শেদার পাঠশালায় এসে শিক্ষার সুযোগ পেয়ে আবারও স্কুলে ভর্তি হয়ে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন। মোর্শেদা হকের বৈকালী পাঠশালার ঘরটি টিনঘেরা ও ছাউনিবিশিষ্ট। চৌকিবাড়ী গ্রামের এক ব্যক্তি ঘরটির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সেই ঘরের মেঝেতে চলে প্রতিবন্ধীদের পাঠদান কার্যক্রম।

সপ্তাহের শনি, সোম ও বুধবার বিকালে প্রতিবন্ধীরা তাদের প্রিয় পাঠশালায় চলে আসে। মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে বসে শিক্ষা গ্রহণ করে তারা। এখানে ৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীও রয়েছে, যারা প্রত্যেকেই অক্ষরজ্ঞান অর্জন করছে। বৈকালী পাঠশালার শিক্ষার্থী মো. রাব্বী জানায়, সে পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর প্রতিবন্ধিতাসহ নানা কারণে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়নি। পরে মোর্শেদা আপার পাঠশালায় গিয়ে শিক্ষার প্রতি ঝোঁক বাড়ে তার। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি এবং পরীক্ষা দিয়ে পাস করার পর এখন সে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। শিক্ষার পাশাপাশি সে মোবাইল হার্ডওয়্যারের কোর্স করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছে। বৈকালী পাঠশালার শিক্ষার্থী আপন, তানিয়া ও জাকির হোসেন জানায়, মোর্শেদা আপার চেষ্টায় তারা বর্ণমালা চিনতে পারে, লিখতে পারে। আগে তারা বর্ণমালা না চিনলেও এখন পারে।

তানিয়ার মা হাওয়া বেগম জানান, তার মেয়ে এখানে এসে অনেক কিছু শিখেছে। ইশারায় এখন সে বেশ ভালোভাবে কথাও বলতে পারে এবং বোঝে। তার পড়ার প্রতি ঝোঁক বেড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা জাহানারা বেগম বলেন, ‘বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার। মেয়েকে কোলে নিয়ে পায়ে হেঁটে স্কুলে দিয়ে আসি। প্রতিদিন কষ্ট করছি। কিন্তু মনেপ্রাণে চাইছি, মেয়েটা একটু পড়তে ও লিখতে পারুক। সে কিছু বর্ণমালা লিখতে পারে। নিজের নামও লিখতে পারে। এর আগে কেউ মেয়েকে শিক্ষার বিষয়ে বলেনি। ’ স্থানীয় বিভিন্ন বয়স্ক ব্যক্তিরা জানান, প্রতিবন্ধীদের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়াতে স্কুলটি বিশেষ ভূমিকা রাখছে। তবে সেটি নানা সমস্যায় জর্জরিত। নেই নিজস্ব কোনো ভবন। নেই শিক্ষা উপকরণ ও আসবাবপত্র। যথেষ্ট অভাবের মধ্য দিয়ে চলছে স্কুলটি।

শারীরিক প্রতিবন্ধীরাও এখানে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে আর মোর্শেদা আপা সেই শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন।

বৈকালী পাঠশালার প্রতিষ্ঠাতা মোর্শেদা হক জানান, প্রতিবন্ধীদের জন্য ভালো কিছু করার উদ্দেশ্য নিয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ পাঠশালা করা। এখান থেকে তারা যেন অক্ষরজ্ঞানসহ নৈতিক শিক্ষা নিতে পারে, তারা যেন আলোর পথের যাত্রী হয়ে সমাজের বোঝা হয়ে না থাকে, সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বেশ কিছু প্রতিবন্ধী শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তি এখন পড়তে পারে। তারা পত্রিকাও পড়তে পারে। সবাই প্রতিবন্ধী হলেও তাদের দেখাদেখি কিছু সুস্থ মানুষও আসছে অক্ষরজ্ঞান আহরণে। বর্তমানে ৩৮ জন শিক্ষার্থী রয়েছে এ পাঠশালায়, যারা সবাই একই গ্রামের বাসিন্দা।

আইটি টেকআয়কর বার্তাজাতীয়প্রচ্ছদ এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন:
কমলাপুর রেলস্টেশনের ঘাস নিয়ে লাইভ করার পর এবার ট্রেনে ওঠার সময় নারী ও বৃদ্ধাদের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ফের ফেসবুক লাইভ করলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন। বৃদ্ধ মা-বাবা, স্ত্রী ও বাচ্চাদের নিয়ে যারা রেলে চলাফেরা করেন তাদের প্রতি কি একটু সহায় হবেন- এমন আহ্বান জানান তিনি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেউ যদি বউ-বাচ্চা, বৃদ্ধা মা-বাবাকে নিয়ে ট্রেনে উঠতে চান তা হলে বউ থাকবে কই আর মা-বাবা থাকবে কই। শুক্রবার (৫ জুলাই) রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ফেসবুকে লাইভে এসে এসব কথা বলেন ব্যারিস্টার সুমন। লাইভে এসে প্ল্যাটফর্ম থেকে ট্রেনে ওঠার সিঁড়ির দূরত্ব দেখিয়ে সুমন বলেন, ‘এই ট্রেনটাকে মিটার গেজ (পরে সংশোধন করে বলেন ব্রডগেজ) বলা হয়। আমার প্রশ্ন হলো-প্ল্যাটফ্রম থেকে দূরত্ব বা উচ্চতা কত? ব্রিটিশ আমলের ট্রেনগুলো ছিল এমন। আপনারা (রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ) নতুন ট্রেন আনলেন কিন্তু প্ল্যাটফর্ম এখনো পুরনো।’ রেলওয়ে স্টেশনে উপস্থিত লোকদের দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘দেখেন সবাই, প্ল্যাটফর্ম থেকে ট্রেনের উচ্চতা দোতলার সমান। কোনো স্টেশনে ট্রেনটি তিন মিনিট থামে। তিন মিনিটে ৫০ জন মানুষ প্রায় দুই তলার সমান উচ্চতায় ওঠা কি সম্ভব?’ রেলমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে ব্যারিস্টার সুমন বলেন, ‘রেলমন্ত্রী, ট্রেন আপনি অনেক উঁচু বানিয়ে দিছেন। আর প্ল্যাটফর্ম এখানে বিট্রিশ আমলের। আমি কমলাপুর সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে বলছি। আর গ্রামের স্টেশনগুলোর অবস্থা তো আরও খারাপ। সেখানে ট্রেনে উঠতে তো রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়। বউ বাচ্চা নিয়ে ওঠা একটা বে-ইজ্জতের কারবার।’ তিনি আরও বলেন, ‘দুনিয়া এগোচ্ছে, সব কিছু এগোচ্ছে। রাতারাতি পরিবর্তন করতে পারবেন না। তবে ব্রেইনে আনেন পরিবর্তন করার। আপনারা বউ-বাচ্চা লইয়া ট্রেনে যাতায়াত করবেন কি-না জানি না। তবে, এই প্ল্যাটফর্ম ট্রেনের সমান করতে কোটি কোটি টাকার দরকার পড়বে না। আশা করি রেলমন্ত্রীসহ সকলেই এর প্রতি সদয় হবেন।’ এর আগে (৩০ মে) ব্যারিস্টার সুমন স্টেশনের সামনে রেললাইনের ওপর বেড়ে ওঠা ঘাস কেটে পরিচ্ছন্ন করার অনুরোধ জানিয়ে তার নিজের ফেসবুক পেজে লাইভ দেন। এর পরদিনই (শুক্রবার) সেসব ঘাস কেটে পরিষ্কার করে ফেলে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। পরিবারকে গ্রামের বাড়িতে পাঠানোর জন্য ট্রেনে তুলে দিতে কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে ফেসবুক লাইভে আসেন ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। সেখানে তিনি দেখেন, রেললাইনের ওপর বড় বড় ঘাস জন্মেছে। যা কাটার জন্য কারো সময় নেই। ব্যারিস্টার সুমন বলেন, ‘রেলের সময় নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই। মোটামুটি ভালোই চলতেছে। এজন্য রেল কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাই।’ ওই লাইভে তিনি আরও বলেন, এটা দেশের সবচেয়ে বড় রেলস্টেশন। এটা কেন্দ্রীয় রেল স্টেশন। এ সময় তিনি এক হাত লম্বা লম্বা ঘাস দেখিয়ে বলেন, ‘কিছু লোক লাগিয়ে ঘাসগুলো পরিষ্কার করলে স্টেশনটা অনেক সুন্দর হয়ে যেত।’
৬ years ago