বাবা-মায়ের কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে দেশের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও ৯ বারের জাতীয় সংসদের সদস্য তোফায়েল আহমেদকে (৮২)।
আগামীকাল মঙ্গলবার (২ জুন) বিকেল আনুমানিক সাড়ে ৪টার দিকে ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে বাবা মৃত আজাহার আলী ও ফাতেমা খানম এবং স্ত্রী আনোয়ারা বেগমের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হবে।
তোফায়েল আহমেদের পরিবার জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে কফিনবাহী একটি হেলিকপ্টার তার মরদেহ নিয়ে ভোলা শহরের বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন হেলিপ্যাডে অবতারণ করবে। এরপর এদিন দুপুরে বাদ জোহর ভোলা শহরের সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তার প্রথম জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর সেখান থেকে মরদেহটি নিজ গ্রাম কোড়ালিয়া নেওয়া হবে এবং বাড়ির সামনে দ্বিতীয় দফায় জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হবে। এছাড়া ভোর থেকে কবর খোঁড়ার কাজ শুরু হবে।
তোফায়েল আহমেদের নাতি কামাল হোসেন জানিয়েছেন, রাজনৈতিক ব্যস্ততার মাঝেও তোফায়েল আহমেদের মতো মা পাগল ছেলে আমরা দেখিনি। যখনই তিনি গ্রামের বাড়িতে আসতেন, তখনই বাবা-মায়ের কবরের পাশে বসে কুরআন তিলোয়াত ও দোয়া করতেন। তিনি ওছিয়ত করে গিয়েছেন, তাকে যেন বাবা-মায়ের কবরের পাশেই সমাহিত করা হয়। তার সেই ইচ্ছা অনুযায়ী বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হবে।
প্রসঙ্গত, সোমবার (১ জুন) বিকেলে রাজধানী ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইজডসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। এর আগে,গত ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর দুপুরে ঢাকায় নিজ বাসভবনে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে আইসিইউতে এবং পরবর্তীতে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এছাড়া গত কয়েক বছর ধরে হুইলচেয়ারে চলাফেরা করছেন তিনি। স্ট্রোকের কারণে তার শরীরের একাংশ প্যারালাইজড হয়ে যায়।
পারিবারিক জীবনী
তোফায়েল আহমেদ ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের তেতুলিয়া নদীর তীরের কোড়ালিয়া গ্রামে মৃত আজাহার আলী ও ফাতেমা খানম দম্পতির ঘরে জন্ম গ্রহণ করেন। মা ফাতেমা খানম তাকে আদর করে ডাকতেন মনু নামে। তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক ও পারিবারিক জীবনে পেছন থেকে সাহস যুগিয়েছিলেন স্ত্রী আনোয়ার বেগম। ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর বার্ধক্যজনিত কারণে তিনিও মৃত্যুবরণ করেন। তোফায়েল আহমেদ মৃত্যুকালে একমাত্র কন্যা ডা. তাসলিমা আহমেদ মুন্নি ও জামাতা ডা. তৌহিদুজ্জামানসহ বহু স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
শিক্ষা জীবনী/ছাত্র জীবনী
১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাশ করেন। এরপর বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ থেকে আইএসসি ও বিএসসি পাশ করেন।
ছাত্রজীবনে তোফায়েল আহমেদ ব্রজমোহন কলেজ ছাত্রসংসদের ক্রীড়া সম্পাদক ও অশ্বিনী কুমার হলের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিভাগ থেকে এমএসসি পাশ করেন এবং ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত ডাকসুর ভিপির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তার নেতৃত্বে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিশোধ তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলেন। তার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুসহ সকল রাজবন্দীকে মুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেন।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনী
তোফায়েল আহমেদের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন। ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের মহানায়কও বলা হয় তাকে। এছাড়া ডাকসুর সাবেক ভিপি, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন।
সর্বশেষ তিনি ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোলা-১ সদর আসন থেকে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়া ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এবং সর্বশেষ নির্বাচিত হন ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে। এরমধ্যে ১৯৯১ ও ৯৬ সালে ভোলা-১ (সদর আসন) ও ভোলা-২ বোরহানউদ্দিন-দৌলতখান) উভয় আসন থেকে নির্বাচিত হন। তাছাড়া ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনেও তিনি জয়ী হন।
