শেষ হল খানজাহান আলী মাজারের দিঘির সাড়ে ৬শ’ বছরের ঐতিহ্য

লেখক:
প্রকাশ: ৫৯ minutes ago

বাগেরহাটেরঐতিহাসিক খানজাহান (র.) এর মাজার সংলগ্ন দিঘিতে থাকা একমাত্র নারী কুমিরটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বুধবার (৩ জুন) দুপুরে স্থানীয়দের সহায়তায় বন বিভাগের কুমিরবিশেষজ্ঞরা দিঘির পূর্বপারের একটি ছোট পুকুর থেকে এই কুমিরটিকে ধরা হয়।
পরে হাতপাও চোখ বেঁধে বন বিভাগের গাড়িতে ওঠানো হয়। গাড়িতে করে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ওপুনর্বাসন কেন্দ্রে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
এদিকে কুমিরটিকে উদ্ধারের জন্য এদিন সকাল থেকেই বন বিভাগসহ প্রশাসনের লোকজন মাজার এলাকায় উপস্থিত হয়। বেলা সাড়ে ১০টার দিকে দিঘির পূর্ব পাড়ে কুমিরটি দেখা মেলে।
পরে তাকে ধরার কার্যক্রম শুরু হয়।১২টার দিকে খাবারের প্রলোভন দিয়ে কুমিরকে বেঁধে ফেলা হয়।

কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দিঘি থেকে তুলে গাড়িতে করে খুলনাতে নিয়ে রওনা করে বন বিভাগ। মাজারের পাড়ে কয়েক হাজার উৎসুক জনতা হাজির হয়। মাজারের কুমিরকে শেষবারের মত দেখার চেষ্টা করেন তারা। তবে নিরাপত্তারস্বার্থে পুলিশ দর্শনার্থীদের কুমিরের কাছে পৌঁছাতে দেয়নি। দূর থেকে কুমির দেখেছেন তারা। তিন দিন আগে কুমিরটির আক্রমণেএক শিশুর মৃত্যু হয়।পরবর্তীতে মঙ্গলবার (২ জুন) রাতে জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে জরুরীসভায় জননিরাপত্তার স্বার্থে প্রাণীটি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

এদিকে কুমিরটিকে সরিয়ে নেওয়ায় সস্তিপ্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। কুমির সরিয়ে নেওয়ার পরে মাজারের প্রধান ঘাটে নির্ভিগ্নে গোসল করতে দেখা যায় দর্শনার্থী ও স্থানীয়দের।

বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা. আতিয়া খাতুন বলেন, জননিরাপত্তার স্বার্থে মাজারের দিঘির কুমিরটি অপসারণের সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী খুলনার বন্যপ্রাণীউদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেওয়া হচ্ছে প্রানিটি।

কুমিরের বিষয়ের পরবর্তীতে কি সিদ্ধান্ত নেয়া হবে তা পরে জানানো হবে বলে এ সময় বলেন তিনি।

কুমির উদ্ধারের সময় খুলনা বিভাগীয় বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ, সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোঃ রেজাউল করিম চৌধুরী, বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল, বাগেরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আবু রাসেল, বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা. আতিয়া খাতুন, বাগেরহাট মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সামসুল আরেফিনসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।

জানা যায়, প্রায় সাড়ে ৬ ‘ বছর আগে এই অঞ্চলের মানুষের সুপেয় পানির চাহিদা পূরণে মাজারের সামনে থাকা এই দিঘিটি খনন করে খানজাহান আলী (রহ.)। তখন পানির সুরক্ষায় কুমির ছাড়া হয় দিঘিতে। পুরুষটার নাম রাখেন কালা পাহাড় ও স্ত্রী কুমিরটার নাম ধলা পাহাড়। এরপর তাদের বংশধর কুমিরদের মধ্যে পুরুষকে ‘কালা পাহাড়’ আর স্ত্রী কুমিরকে ‘ধলা পাহাড়’ ডাকা হতো। কিন্তু পরবর্তীতে বংশ পরম্পরায় কালা পাহাড় ও দলা পাহাড় হিসেবে যুগের পর যুগ টিকেছিল কুমিরগুলো। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে প্রজনন না হওয়া, ঘুমের ঔষধ এবং মাছ ধরা জালে বেঁধে আহত হওয়ার কারণে খানাজাহানের ছাড়া কুমিরগুলো মারা যেতে শুরু করে। সর্বশেষ বংশধরের মৃত্যু হয় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে।

কিন্তু কুমির যখন আশঙ্কা জনকভাবে কমছিল, তখন ২০০৫ সালে ভারত থেকে কয়েকটা কুমির এনেদিঘিতে ছাড়া হয়; কিন্তু এর কয়েকটা মারা যায়। সর্বশেষ যে দুটো ছিল, তার একটা ২০২৩সালের অক্টোবরে মারা যায়। এর পর থেকে একটা কুমিরই দিঘিতে ছিলো। এর মধ্য দিয়ে খানাজাহান আলী (রহ) এর মাজার সংলগ্ন দিঘিতে কুমিরের সাড়ে ৬শ’ বছরের ইতিহাসেরসমাপ্তি হল বলে মনে করছেন অনেকে। তবে প্রশাসন বলছে উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে আবারও কুমিরটি বা অন্য কুমির এখানে অবমুক্ত করা হবে।

স্থানীয় খাদেমদের দাবি, খানাজাহান আলী (রহ) এর আমলে ছাড়াকুমিরের বংশধরা তেমন আক্রমান্তমক ছিলো না। মূলত মাদ্রাজ থেকে আনা কুমিরগুলো আক্রমন করতে থাকে। সব শেষ সোমবার রাতে ফাতেমা আক্তার নামের এক শিশুকে কুমির নিয়ে যায় এবং পরের দিন তার মরদেহ পাওয়া যায়। এর আগে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রধানঘাটে কুমিরের আক্রমনে সেখাম আলী নামের এক বৃদ্ধ আহত হয়। ২০২০ সালের দিকে এক কিশোরকে আক্রমন করেছিল মাজারের কুমির। চলতি বছরের এপ্রিলে কুমিরের আক্রমনে কুকুরমারা যাওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে দেশজুড়ে।